Sunday , 26 March 2017
Home / Crime News / মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছিল! জানুন সেই হৃদয় কাঁপানো তথ্য!

মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছিল! জানুন সেই হৃদয় কাঁপানো তথ্য!

Loading...

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ধর্ষণ বলতে বোঝানো হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে ধর্ষিত বাঙালী নারীদের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর সদস্যগণ দুই থেকে চার লক্ষ বাঙালী নারীকে ধর্ষণ করে।]

গবেষকদের মতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমান এবং সংখ্যালঘু হিন্দু উভয় সম্প্রদায়কে ভীত সন্ত্রস্থ করতে এই ধর্ষণ চালানো হয়। এর ফলে সহস্র রমনী গর্ভধারণ করে, যুদ্ধ শিশুর জন্ম হয়, গর্ভপাত, আত্মহত্যা ইত্যাদি সমস্যার সূত্রপাত হয়। পাক হানাদার ও তাদের সহযোগী বাহিনীর আত্মসমর্পনের মাধ্যমে এই যুদ্ধাপরাধের সমাপ্তি ঘটে।প্রথমদিকে ভারত দাবী করেছিলো যে তারা মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করছে। পরবর্তীতে তারা মানবাধিকারের প্রেক্ষাপট থেকে এই যুদ্ধে অংশ নেয়াকে ব্যাখ্যা করে। কিন্ত জাতিসংঘ তাদের এই দাবী অগ্রাহ্য করলে তারা দাবী করে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহনের মানবিক দিকটাই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪০ বছর পরে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে ধর্ষনসহ বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধে ১,৫৯৭ জন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে।

 

২০১০ থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল কয়েক জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দিয়েছে। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে এবং চিত্রকর্মে ধর্ষিতাদের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

 

‘বীরাঙ্গনা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘বীর নারী’; জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই যুদ্ধকালীন সময় লাঞ্ছিত, নির্যাতিত নারীদের বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়েছিলেন।[২৯] স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভের পর যুদ্ধকালীন সময় ধর্ষিত নারীদেরকে ‘ধর্ষিতা রমণী’, ‘অপমানিতা রমণী’, ‘দুঃস্থ মহিলা’, ‘ধর্ষণের শিকার’, ‘সৈন্যদের নিপীড়নের শিকার’, ‘ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা’, ‘ভাগ্যবিড়ম্বিতা’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করা হতো। ১৯৭২ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতিত মহিলাদের জন্য সরকার বাংলাদেশ মহিলা পূনর্বাসন বোর্ড গঠন করে ধর্ষিতা মহিলাদের জন্য গৃহীত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নির্যাতিতাদের মর্যাদা সমুন্নত করার উপায় উদ্ভাবন প্রচেষ্টা নেয় এবং জাতীয় পর্যায়ে তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেন বীরাঙ্গনা খেতাব প্রদানের মাধ্যমে।

Loading...

জেনারেল টিক্কা খান, যিনি ছিলেন অপারেশন সার্চলাইট-এর প্রণেতা, তার নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনি বাংলাদেশে আক্রমণ পরিচালনা করে এবং তিনি তার কর্মকান্ডের জন্য বাঙালিদের নিকট থেকে ‘বাংলার কসাই’ অভিধা লাভ করেছিলেন। ১৯৭১ সালে ২৭ মার্চ “আমি এই এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে একটি সংখ্যালঘুতে পরিণত করবো” – এই বক্তব্যের দ্বারা খান স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের দ্বায়িত্বে আছেন।[৩১][৩২] বীনা ডি’কোস্টা মনে করেন যে খানের ব্যবহৃত এই উপমাটি একটি সংকেত যার মাধ্যমে তিনি সামরিক অভিযানকালে গণধর্ষণকে একটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত কৌশল হিসাবে গ্রহণের প্রমাণপত্র প্রদান করেছেন। যশোরে সাংবাদিকদের একটি দলের সঙ্গে আলাপকালে খান “প্যাহেলে উনকো মুছলমান কারো” (প্রথম এদেরকে মুসলমান বানাও) বলে উক্তি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। ডি’কোস্টা যুক্তি দেখান যে, এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের নিকট বাঙালিদের সম্পর্কে অনুভূতি হচ্ছে আনুগত্যহীন মুসলমান এবং দেশপ্রেমহীন পাকিস্তানী।

রাতের বেলা অভিযান পরিচালনাকালীন আক্রমনকারীরা গ্রামের মহিলাদের উপর চড়াও হতো;[] প্রায়শঃই ত্রাস সৃষ্টির অংশ হিসেবে তাদের পরিবারের সামনেই এগুলো ঘটানো হতো।[] এছাড়াও ৮ থেকে ৭৫ বছর বয়সী নির্যাতিতাদের অপহরণ করে বিশেষভাবে নির্মিত ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো যেখানে তারা পুনঃ পুনঃ লাঞ্ছিত হতো। ক্যাম্পে বন্দি থাকা অনেককেই হত্যা করা হয় অথবা তারা নিজেরাই আত্মহত্যা করে;[৩৬][৩৭] কিছু নারী তাদের নিজেদের চুল ব্যবহার করে আত্মহত্যা করায় সৈন্যরা বন্দিনিদের চুল কেটে দেয়।[] যারা অপহৃৎ হয়েছিলো এবং সেনাবাহিনী দ্বারা অাটক ছিলো এধরণের ৫৬৩ জন নারী সম্পর্কে টাইম ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় যেখানে বলা হয় যখন সেনাবাহিনী তাদেরকে মুক্তি দেয়া শুরু করে তখন এদের সকলেই তিন হতে পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিলো।[] কিছু নারীকে জোরপূর্বক পতিতাবুত্তিতে বাধ্য করা হয়।[] পাকিস্তান সরকারের হিসাব মতে যেখানে ধর্ষনের সংখ্যা শতাধিক[] সেখানে অন্যান্য হিসাব মতে এই সংখ্যা আনুমানিক ২,০০,০০০[] হতে ৪,০০,০০০।[] পাকিস্তান সরকার নির্যাতন সম্পর্কিত প্রতিবেদন এই অঞ্চলের বাহিরে পাঠাতে বাঁধা দান চেষ্টা করলেও কিন্তু গণমাধ্যমে নৃশংসতার সংবাদ বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হওয়ায় সাধারণ্যে তা পৌঁছে যায় এবং এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ব্যাপক আন্তর্জাতিক জনসমর্থন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।[]

জেনিক এ্যারিন্স কর্তৃক বিবৃত আছে যে কোন একটি জাতিগত গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা হিসেবে অসংখ্য নির্যাতিতা ধর্ষিত হয়, হত্যা করা হয় এবং এরপর যৌনাঙ্গের মধ্যে বেয়নেট দ্বারা আঘাত করা হয়।[] কানাডীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম জোনস বলেছেন যে, এই গণ-ধর্ষণের অন্যতম একটি কারণ ছিল বাঙালি নারীদের “অসম্মান” করার মাধ্যমে বাঙালি সমাজের মনোস্তাত্বিকভাবে পতন ঘটানো এবং সেজন্য কিছু নারীকে মৃত্যু না-হওয়া পর্যন্ত ধর্ষন করা হয় অথবা বারংবার এভাবে আঘাতের কারণে নিহত হয়।[] পাকিস্তানী সেনাবাহিনি বাঙালি পুরুষদেরও ধর্ষণ করেছিলো। পুরুষেরা যখন কোন একটি তল্লাশীকেন্দ্র পার হতো তখন তাদেরকে খৎনা করানো হয়েছিল কি-না তা প্রমাণ করতে নির্দেশ দেয়া হতো এবং এখানেই এধরণের ঘটনাগুলো সাধারণতঃ ঘটতো।[] ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস মন্তব্য করেছেন যে, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা ছিলো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী দ্বারা স্বেচ্ছায় গৃহীত নীতির একটি অংশ”।[] লেখক মুলক রাজ আনন্দ পাকিস্তানি সেনাবাহিনির কার্যক্রম সম্পর্কে বলেছেন, “ধর্ষনগুলো এতোটাই পদ্ধতিগত এবং পরিব্যাপক ছিলো যে এগুলো সচেতনভাবে গৃহীত সমর-নীতির অংশ ছিলো, “পশ্চিম পাকিস্তানীদের কর্তৃক পরিকল্পিত একটি নতুন জাতি তৈরি করতে ইচ্ছাকৃতভাবে” অথবা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে হালকা করে দিতে”। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণ করার পর অমিতা মালিক বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, একজন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিক বলেছে যে:. “আমরা যাচ্ছি। কিন্তু আমরা পেছনে আমাদের উত্তরসুরি রেখে যাচ্ছি”।[]

সকল পাকিস্তানী সামরিক ব্যক্তিবর্গ সহিংসতাকে সমর্থন করেননি; জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান, যিনি রাষ্ট্রপতিকে সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিলেন,[] এবং মেজর ইকরাম সেহগাল, উভয়ই প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন; একইভাবে পদত্যাগ করেন এয়ার মার্শাল আসগর খান। বেলুচ রাজনীতিবিদ মীর গাউস বখশ বাইজেনজু এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা খান আব্দুল ওয়ালী খান সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রমের প্রতিবাদ করেছিলেন। এই সকল প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব, যারা সহিংসতার বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণ করেন এবং তাদের সাথে সাবিহউদ্দিন গাউসি এবং আই এ রহমান নামীয় দুজন সাংবাদিক, সিন্ধি নেতা জি এম সৈয়দ, কবি আহমাদ সালিম, বিমান বাহিনীর সদস্য আনোয়ার পীরজাদা, অধ্যাপক এম আর হাসান, তাহেরা মাজহার এবং ইমতিয়াজ আহমেদকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিলো। মালিক গোলাম জিলানিকেও গ্রেফতার করা হয়েছিলো প্রকাশ্যে বাংলাদেশে সশস্ত্র আক্রমণের বিরোধিতা করায় এবং ইয়াহিয়া খানকে লেখা বহুল প্রচারিত একটি খোলাচিঠির জন্য। এছাড়াও কারারুদ্ধ করা হয় ডন পত্রিকার সম্পাদক আলতাফ হোসেন গওহরকে। ২০১৩ সালে জিলানি এবং কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজকে তাদের সহমর্মীতামূলক কর্মকান্ডের জন্য বাংলাদেশ সরকার সম্মননা প্রদাণ করেন।[]

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিটার টমসনের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগনকে রুখতে পাকিস্তানী সিক্রেট সার্ভিস ( আইএসআই) রাজনৈতিকদল জামাতে ইসলামী এর সাথে মিলিত হয়ে আল বদর (চাঁদ), আল শামস (সূর্য) এর মত মিলিশিয়া আধা সামরিক বাহিনী গঠন করে।[][] এই সকল বাহিনী নিরস্তদের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করতো এবং অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের মত যুদ্ধাপরাধে অংশ নিয়েছে।[স্থানীয় সহযোগী যারা রাজাকার নামে পরিচিত তারাও এই সকল ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলো।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত মুসলিম লীগ, নিজামে ইসলাম, জামাতে ইসলাম এবং জমিয়তে উলামা পাকিস্তান দলের সদস্যরা সামরিক বাহিনীর সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে এবং তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সারীর বেশ কিছু নেতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে যোগসাজশ এবং ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে স্থাপিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে এদের কয়েক জনের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে গণহত্যা এবং ধর্ষণ বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে।

Facebook Comments
loading...

Leave a Reply