Thursday , 27 April 2017
Home / Exclusive / জেনে নিন, মেট্রো রেলের আদ্যোপান্ত
loading...

জেনে নিন, মেট্রো রেলের আদ্যোপান্ত

Loading...

জেনে নিন, মেট্রো রেলের আদ্যোপান্ত

সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাজপথে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন যে, মেট্রোরেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে চলাচল করলে প্রচণ্ড শব্দ ও তীব্র কম্পনের ফলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। গণতান্ত্রিক দেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার সবারই আছে, আর সে প্রতিবাদ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা করেন তবে তা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কয়েকজন যে যুক্তি উপস্থাপন করছেন_ ‘প্রচণ্ড শব্দ ও তীব্র কম্পনের সৃষ্টি হবে’, তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য সে বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।

সেক্সের সময় এই ভুলগুলো করলে কখনোই সন্তান হবে না আপনার! জেনে নিন কি সেই ভুল… More stats
স্ত্রী স্বামীর উপরে উঠে সহবাস করতে পারবে কি? ইসলাম কি বলে? More stats
মেয়েদের চরম সুখ পেতে কত মিনিট মিলন দরকার হয়? না জানলে জানুন More stats
জেনে নিন নারীদের যৌন ইচ্ছা কত বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় ! More stats

প্রথম অভিযোগটি হলো মেট্রোরেল চলাচলে আশপাশে তীব্র কম্পনের সৃষ্টি হবে। আসলেই কি তাই? মেট্রোরেল প্রকল্পটিতে কম্পন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। মেট্রোরেলের লাইনের নিচে এমএসএস (ম্যাস স্প্রিং সিস্টেম) থাকবে। ম্যাস স্প্রিং সিস্টেমে বিশেষ ধরনের বিয়ারিং থাকে, যার কাজ হলো রেললাইনে যে কম্পন তৈরি হয় তা শোষণ করা। এর ফলে ট্রেন চলাচলের সময় আশপাশে তেমন একটা কম্পন অনুভূত হবে না। এর পরের অভিযোগটি হলো_ মেট্রোরেল চলাচলে আশপাশে প্রচণ্ড শব্দের সৃষ্টি হবে। মেট্রোরেল প্রকল্পটিতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেরও বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। প্রথমে আমরা জেনে নিই আমাদের পরিচিত কিছু উৎস থেকে কী মাত্রার শব্দের সৃষ্টি হয় ও মানবদেহের জন্য তা কতখানি ক্ষতিকারক। যখন এয়ার কন্ডিশনার চলে তখন ৬০ ডিবিএ (ডেসিবেল) মাত্রার শব্দ তৈরি হয়, ব্যক্তিগত গাড়ি যখন ২৫ থেকে ৩৫ মাইল ঘণ্টায় চলে, তখন ৬০-৭০ ডিবিএ মাত্রার শব্দ তৈরি হয়, টয়লেট ফ্ল্যাশিংয়ের সময় ৭৫ ডিবিএ মাত্রার শব্দ তৈরি হয়, বাস-ট্রাক যখন ২৫ থেকে ৩৫ মাইল ঘণ্টায় চলে, তখন ৮০-৮৮ ডিবিএ মাত্রার শব্দ তৈরি হয়। আমরা যখন রক কনসার্ট শুনি তখন ১১০ ডিবিএ মাত্রার শব্দ তৈরি হয়, যা মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। সাধারণ ট্রেন ৩০ মাইল ঘণ্টায় চলার সময় ৭০-৭৫ ডিবিএ মাত্রার শব্দ তৈরি করে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে শব্দ তৈরির মাত্রা সাধারণ ট্রেনের চেয়েও কম, যা মানবদেহের জন্য সহনীয়। এখানে উল্লেখ্য, ৮৫ ডিবিএ মাত্রার শব্দ ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত মানবদেহের জন্য সহনীয়। এ ছাড়াও মেট্রোরেলের চলাচল পথে কিছু এলাকায় শব্দ শোষণকারী দেয়াল থাকবে। এই দেয়ালের ফলে শব্দের মাত্রা আরও কমে আসবে।

Loading...

মেট্রোরেল প্রকল্পটিতে বিদ্যুৎচালিত আধুনিক ট্রেনে যাত্রীরা চলাচল করবে। ভিভিভিএফ (ভেরিয়েবল ভোল্টেজ ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি) ইনভার্টার সিস্টেমে চালিত ট্রেন চলার সময় অনেক কম শব্দ তৈরি করে, যা শব্দদূষণের পর্যায়ে পড়ে না। মেট্রোরেল প্রকল্পটি চালু হলে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাস ব্যবহারকারী অনেক যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করবে। এর ফলে বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ অনেক কমবে। বাসের ক্ষেত্রে বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ৫১ গ্রাম বা যাত্রী-কি.মি, ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ১৬৮ গ্রাম বা যাত্রী-কি.মি.। অন্যদিকে মেট্রোরেল যেহেতু বিদ্যুৎচালিত তাই বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ নেই বললেই চলে। এসব বিবেচনায় মেট্রোরেল অনান্য পরিবহন ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব।

রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যা এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে, গণপরিবহন হিসেবে সাধারণ বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যানজট সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে বড় বিকল্প হচ্ছে মেট্রোরেল। বিশ্বের সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা এই মেট্রোরেল প্রকল্প রাজধানীর যানজট সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে আনবে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও মেট্রোরেলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেট্রোরেল প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা পাওয়া যাবে জাইকার কাছ থেকে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে। বাকি টাকার সংস্থান করবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরা থেকে মাত্র ৩৭-৪০ মিনিটেই পেঁৗছানো যাবে মতিঝিলে। মেট্রোরেলে ১৬টি স্টেশন থাকবে। অর্থাৎ দুটি স্টেশনের মধ্যে গড় দূরত্ব হবে ১ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার। বেশি স্টেশন রাখার ফলে বিপুলসংখ্যক যাত্রী এর সুফল ভোগ করবে। এই ১৬টি স্টেশন হচ্ছে_ উত্তরার উত্তর, উত্তরা কেন্দ্র, উত্তরার দক্ষিণ, পল্লবী, আইএমটি, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশ ব্যাংক। স্টেশনগুলো হবে ওপরে এবং নিচ থেকে লিফট বা চলন্ত সিঁড়ির মাধ্যমে যাত্রীদের ওপরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। মেট্রোরেল পূর্ণ সক্ষমতায় ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। এর গতি হবে গড়ে ঘণ্টায় ৩২ কিলোমিটার, যদিও এটি সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার চলতে সক্ষম। পিক আওয়ারে ৪ মিনিট পরপর একটি ট্রেন এবং অফ-পিক আওয়ারে ৭ মিনিট পরপর একটি ট্রেন চলবে। শীতকালে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ও গ্রীষ্মকালে সকাল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ট্রেন চলবে। মেট্রোরেল প্রকল্পের অবকাঠামো ১০০ বছরের জন্য ডিজাইন করা হবে।

বৈদ্যুতিক ট্রেন ঝুলন্ত সিম্পল ক্যাটনারি ওয়্যার সিস্টেম থেকে ১৫০০ ভোল্টেজ ডিসি বিদ্যুতের সাহায্যে চলবে। ভোল্টেজের তারতম্য ৯০০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত। মেট্রোরেলের নির্ধারিত রুট অনুযায়ী উত্তরা থেকে পল্লবী, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, প্রেস ক্লাব ও মতিঝিল পর্যন্ত যাবে। মেট্রোরেল পুরোটাই হবে উড়ালপথে। বিদ্যমান সড়কের মাঝখানে আড়াই মিটার জায়গা নেওয়া হবে। উচ্চতা হবে মাটি থেকে ৮-১৩ মিটার পর্যন্ত। তিন পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে প্রকল্পটি। প্রথম পর্যায়ে ২০১৯ সালে পল্লবী থেকে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার পথ চালু হবে। ২০২০ সালে সোনারগাঁও থেকে মতিঝিল এবং ২০২১ সাল নাগাদ উত্তরা থেকে পল্লবী অংশে মেট্রোরেল চালু হবে। মোট আটটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হবে এ প্রকল্পের কাজ।

২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন দরপত্র প্রক্রিয়া চলবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চুক্তি সই হতে পারে। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রাজধানীতে মেট্রোরেল রুট নির্মাণে ইতিমধ্যে অ্যালাইনমেন্ট ও ১৬টি স্টেশনের নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। শেষ হয়েছে প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন স্থানে চালানো ভূতাত্তি্বক জরিপ। ঠিক সময়মতো এ প্রকল্পের সফল পরিসমাপ্তির দিকেই তাকিয়ে আছে এখন ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষ।
.
ড. মো. মিজানুর রহমান
অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র >> ১৯, জানু, সমকাল

Facebook Comments
loading...

Leave a Reply