নভেম্বর ডায়াবেটিস সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষে ২৪ নভেম্বর কংগ্রেসিয়া ও প্রথম আলোর আয়োজনে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার’। সহযোগিতায় ছিল হেলদি লিভিং ট্রাস্ট। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল। তাঁর বক্তব্যটি এখানে তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজলছবি: প্রথম আলো
আমি যেসব রোগী দেখি, তাঁদের প্রায় শতভাগই গর্ভকালীন ইনসুলিন পান। বেশির ভাগ সময় জটিল রোগীকে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। জটিলতা কেন ঘটেছিল, সেটা যখন অনুসন্ধান করতে যাই, তখন আমরা ডায়াবেটিস পাই। দিন দিন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বাড়ছে। কেন বাড়ছে? অন্যান্য মানুষের মধ্যে যে কারণে ডায়াবেটিস বাড়ছে, গর্ভকালে সেই কারণের পাশাপাশি আরও কিছু হরমোনাল কারণ থাকে। যেসব হরমোন অনাগত সন্তানকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, সেগুলো ব্লাড সুগারও বাড়ায়। কাদের বাড়ায়? যাঁরা ঝুঁকিতে ছিলেন, সেই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের।
বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, প্রতি চারজনে একজন অথবা প্রতি তিনজনে একজন গর্ভকালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। আরেকটি কারণ, অধিক বয়সে মা হওয়ার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এখন ৩৫, ৪০, ৪৫ বছর বয়সেও মা হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। বন্ধ্যত্ব রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেকে এমন বয়সে এসে মা হচ্ছেন, যে বয়সে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ডায়াবেটিস হওয়ার কথা।
ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার– শীর্ষক বৈঠকে আলোচকেরা। ২৪ নভেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার– শীর্ষক বৈঠকে আলোচকেরা। ২৪ নভেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো
এখন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কীভাবে শনাক্ত করব? গর্ভকালে যদি খালি পেটে ৫.১–এর ওপরে যায় এবং ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে ৮.৫–এর ওপরে যায়, তাহলে আমরা বলি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়।
এখন এ ধরনের ডায়াবেটিসের মাত্রা নির্ণয় করা ও কোন টার্গেটে রাখতে হবে, সেটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব আছে। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, চিকিৎসকদের কাছেও অনেক সময় এটা খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। অথচ খুব সামান্য ব্লাড সুগার বৃদ্ধি, কম সময়ের জন্য হলেও গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে।
গর্ভকালে যদি সঠিক মাত্রায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে মায়ের গর্ভপাত হতে পারে, বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম হতে পারে, সন্তান গর্ভে মারা যেতে পারে, সময়ের আগে সন্তানের জন্ম হতে পারে। মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ও খিঁচুনি হতে পারে। একলাম্পশিয়া হয়ে মা মারাও যেতে পারেন। প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েও মারা যেতে পারেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও একলাম্পশিয়া বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। অন্যদিকে শিশুমৃত্যুর কারণের মধ্যে আছে অপরিণত হয়ে জন্ম ও কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ। এই দুটোর পেছনেও অনেক সময় মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দায়ী হয়ে থাকে।
এগুলোর কিছুই যদি তখন না-ও হয়, তবু কী হতে পারে জানেন? মায়ের গর্ভের সন্তানটি হয়তো ওই নয় মাসে কোনো জটিলতায় পড়ল না। কিন্তু সে গর্ভ থেকেই এই ঝুঁকিতে পড়ে গেল যে সে অল্প বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবে। অর্থাৎ গর্ভকালে যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে ভবিষ্যতে একটি নতুন ডায়াবেটিক নাগরিক তৈরি হচ্ছে। আমরা যদি মাতৃমৃত্যুহার কমাতে চাই, সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে চাই এবং মেধাবী প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, তাহলে গর্ভকালে ডায়াবেটিসের সঠিক নির্ণয় ও সঠিক মাত্রা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।